অপচয়ের থলি বাড়ানো বন্ধ করো !
অপচয়ের থলি বাড়ানো বন্ধ করো ========================
পানির নল থেকে পানি টিপটিপ করে বয়ে চলেছে, অনিয়ন্ত্রিত, অবিরাম। কোথাও যেন তার বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই। আমরা দাঁত মাজার সময় কল ছেড়ে দিই, ভুলে যাই। কিংবা আরও খারাপ অবস্থা, ভুলিই না— বরং আমরা ভাবিই না। ঝরনাধারার মতো সেই পানি তখন ঝরে পড়ে, থেমে থাকে না, আমরাও ফিরে তাকিয়ে দেখি না। কখনো রান্নাঘরে হাঁড়ির নিচে অনির্দিষ্টকাল ধরে আগুন জ্বলছে, অথচ চোখ সেখানে নেই। অগ্নিশিখার নীলচে দহনে রান্না শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু চুলা জ্বলছেই। অসাবধানতাবশত রুমের পাখা ঘুরছে, বাতি জ্বলছে, অথচ ঘর ফাঁকা। রুমে আমরা কেউ নেই। কিন্তু অপচয় রয়ে গেছে। যেন এক নির্বাক আত্মা, আমাদের ছায়ার মতো পিছু নিয়েছে।
তারপর আসে খাবার। প্লেটে পড়ে থাকা শেষ কয়েক লোকমা, যা আমাদের উদাসীনতায় ফেলে দেওয়া হয়। ক্ষুধা ফুরিয়েছে, কিন্তু তৃষ্ণা? না, তৃষ্ণা ফুরোয় না, আমাদের অবিবেচনার তৃষ্ণা অক্ষয়। হয়তো এক চুমুক পানি ফেলে দিই অবহেলায়, হয়তো অর্ধেক খাবার জিনিসপত্রের সঙ্গে মিশে যায় আবর্জনার স্তুপে। কিন্তু কী অবলীলায় আমরা ভুলে যাই যে এই প্রতিটি কণা, প্রতিটি ফোঁটা কোনো না কোনো শ্রমের, কারো না কারো প্রতীক্ষার ফসল।
অপচয়—একটি শব্দ, অথচ এক মহা বিপর্যয়। এটি কেবল বস্তুগত নয়, সময়, জ্ঞান, অনুভূতি—সব কিছুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমরা সময় অপচয় করি আলস্যে, প্রতিভা নষ্ট করি অবহেলায়, জ্ঞান অপচয় করি অজ্ঞতায়। অথচ প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সম্পদ আমাদের জন্য এক পবিত্র আমানত।
অপচয়ের ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি
অপচয় কেবল অভ্যাস নয়, এটি এক প্রবণতা, যা মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে রাখে। আর এই অপচয় যে কত ভয়ংকর, তা কোরআনই আমাদের জানিয়ে দিয়েছে:
> “নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।”
[ সূরা আল-ইসরা, আয়াত নং ২৭ ]
শয়তান বিভ্রান্তির প্রতীক, ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি। যে অপচয় করে, সে শয়তানের নিকটতম সঙ্গী হয়ে যায়। কারণ, অপচয় কেবল সম্পদের অপচয় নয়, এটি জীবনের, নৈতিকতার, মানবতার অপচয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
> “তোমরা খাও, পান করো এবং দান করো, তবে অহংকার করে নয় ও অপচয় করে নয়। কারণ আল্লাহ তা‘আলা নেয়ামতের ব্যবহার বান্দার কাছ থেকে দেখতে চান।”
(ইবনু মাজাহ, হাদিস: ৩৬০৫)
অর্থাৎ, ইসলামে উপার্জন ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অতি ব্যয় যেমন নিন্দনীয়, তেমনি অতি কৃপণতাও। তাই মুসলমানের উচিত মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, যা আল্লাহর প্রিয়:
> “যারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে মধ্যবর্তিতা অবলম্বন করে—প্রয়োজনের চাইতে বেশি ব্যয় করে না এবং কমও করে না।”
(সূরা আল-ফুরকানঃ ৬৭)
অপচয়ের দার্শনিক দৃষ্টিকোণ
অপচয়ের গভীরে লুকিয়ে আছে এক ধরনের আত্মবিস্মৃতি। মানুষ যখন অযথা নষ্ট করে, তখন সে মূলত নিজেকে ভুলে যায়। নিজের প্রয়োজনের পরিধি ভুলে যায়, দায়িত্ব ভুলে যায়, অন্যের অধিকার ভুলে যায়।
এই ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতিই আধুনিক সমাজকে এক অদৃশ্য প্রলয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনের চকচকে আলোয় মানুষ বুঝতে পারে না কী তার সত্যিকারের প্রয়োজন আর কী কৃত্রিম চাহিদা। বিপণন কৌশল মানুষকে বোঝায়, ‘তোমার হাতে যা আছে, তা যথেষ্ট নয়। আরও চাই, আরও চাই।’ ফলে জন্ম নেয় এক অসীম তৃষ্ণা, যা কোনোদিন মিটবে না।
আমরা যখন প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু কিনি, তখন ভাবি না, আমাদের এই অতিরিক্তের পেছনে হয়তো কারো প্রয়োজনের অপূর্ণতা লুকিয়ে আছে। আমরা যখন অপ্রয়োজনীয় কিছু ফেলে দিই, তখন বুঝতে পারি না, পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে কেউ হয়তো সেই ফেলে দেওয়া বস্তুটির জন্য হাহাকার করছে।
সমাজে অপচয়ের প্রভাব
অপচয় শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, এটি সমাজেরও অবক্ষয়ের কারণ। এর ফলাফল ভয়াবহ:
১. পরিবেশ দূষণ: শিল্পবিপ্লবের পর থেকে আমরা এত বেশি অপচয় করছি যে প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারাতে বসেছে। প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক বর্জ্য, রাসায়নিক অপচয়—সবকিছু মিলে আমাদের পৃথিবী ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে।
২. সম্পদের বৈষম্য: পৃথিবীর এক অংশের মানুষ বিলাসিতার সাগরে ভাসছে, আরেক অংশ ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্নায় মুখ লুকোচ্ছে। এই অসমতাই অপচয়ের নির্মম পরিণতি।
৩. নৈতিক অবক্ষয়: মানুষের মধ্যে সংযমের শিক্ষা হারিয়ে যাচ্ছে। তারা শিখছে, ‘যা ইচ্ছে তা করো, যত খুশি নষ্ট করো, তাতে কিছু যায় আসে না।’ কিন্তু সত্যি কি কিছু যায় আসে না?
সমাধান: সচেতনতা ও মিতব্যয়িতা
অপচয় রোধের জন্য আমাদের জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। ছোট ছোট অভ্যাস বদলালেই আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারি:
১. পানি ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ: অপ্রয়োজনীয় কল, বাতি বা ফ্যান চালিয়ে না রাখা।
২. খাবার সংরক্ষণ: প্রয়োজন অনুযায়ী রান্না করা, অতিরিক্ত খাবার অপচয় না করা।
৩. সঠিক সম্পদ ব্যবহার: অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমানো, পুরোনো জিনিস পুনর্ব্যবহার করা।
৪. সময় ও জ্ঞানের যথাযথ ব্যবহার: অকারণে সময় নষ্ট না করে, সৃষ্টিশীল কাজে যুক্ত হওয়া।
উপসংহার
অপচয় কেবল আমাদের সম্পদের অপচয় নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতেরও অপচয়। এটি আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়, বিবেকের অবসান। আমরা যদি সত্যিই উন্নত, সচেতন ও দায়িত্বশীল জাতি হতে চাই, তাহলে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সংযম ও মিতব্যয়িতা চর্চা করতে হবে।অপচয়ের থলি কি আমরা সত্যিই ফেলে দিতে পারবো? যদি পারি, তাহলে সেটাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন—একটি সুশৃঙ্খল, সচেতন, ও আলোকিত জীবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ।
অপচয় শুধু অভ্যন্তরীণ শূন্যতারই নয়, এটি এক ধরনের অজ্ঞতা, যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা তৈরি করে। আমরা যদি সচেতন না হই, তবে এ অপচয় আমাদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে এক গভীর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাহলে, অপচয়ের থলি আর বাড়াতে চাই না। প্রতিটি ফোঁটা, প্রতিটি মুহূর্তকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই—এটাই হবে আমাদের সচেতনতা, আমাদের দায়িত্ব এবং আমাদের মানবিকতার উৎকর্ষ।
অপচয়ের থলি বাড়ানো বন্ধ করো
© হাফেজ এস এম রেজাউল আলম

মা শা আল্লাহ! দারুণ লিখেছেন. এটি বিভিন্ন মাধ্যমে গণ সমাজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করুন, এটির মাধ্যমে সমাজে সুন্দর পরিবর্তন আসবে বলে সেই আশা করছি.
উত্তরমুছুন