নিভু নিভু প্রদীপ
নিভু নিভু প্রদীপ
===================
রামাদান আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে, নিয়ে আসছে অফুরন্ত রহমত, অগণিত কল্যাণের দ্বার। এটি সেই মাস, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত সাজানো থাকে সুযোগের মালায়—গুনাহ মাফ করানোর, আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার, আল্লাহর নৈকট্য লাভের। কিন্তু আমরা কি সত্যিই এই মাসের মূল্য বুঝি? যদি বুঝতাম, তবে কি একে অবহেলায় পার করে দিতাম?
রামাদান ঠিক সেই সফরের মতো, যেখানে গন্তব্য জান্নাত, আর পথপ্রদর্শক হলো তাকওয়া। কিন্তু যদি কেউ এ যাত্রায় অলসতা করে, দেরি করে, কিংবা মাঝপথে বিরতি নিয়ে বসে থাকে, তবে সে কি আদৌ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে?
প্রতিবারের মতো এবারও হয়তো কেউ কেউ রামাদানকে স্বাগত জানাবে উৎসাহহীন হৃদয়ে, নিয়মের বৃত্তে আবদ্ধ কিছু রুটিনে সীমাবদ্ধ রেখে। অথচ, যে রামাদান আল্লাহর অসীম দয়া, ক্ষমা আর মুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে, সে রামাদানই যদি আমাদের জীবনকে বদলে দিতে না পারে, তাহলে আমাদের চেয়ে হতভাগা আর কে? আমাদের চেয়ে অসফল আর কে আছে? সফল তারাই, যারা এই পবিত্র মাসের প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগিয়ে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করে। প্রিয় নবী (ﷺ) এই সফলতাকে দাস মুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
রামাদান আসলে একটি বিশাল সাগর। এই সাগরে যে ডুব দিতে জানে, সে পায় মুক্তো। কিন্তু কেউ যদি কেবল তীরে দাঁড়িয়ে থাকে, ভয় পায়, দ্বিধায় থাকে—সে কখনো মুক্তোর দেখা পাবে না। আবার রামাদান যেন এক উর্বর মাটি, যেখানে আল্লাহ আমাদের আমলের বীজ বপনের সুযোগ দেন। কিন্তু কেউ যদি সেই মাটিতে বীজ ফেলতে দেরি করে, কিংবা একেবারেই ফেলে না—তাহলে ফসল কেমন করে জন্মাবে? কোনোভাবেই ফসল জন্মাবে না। এবার প্রশ্ন হলো, আমরা কোন দলে প্রবেশ করতে চাই? সফলতা পাওয়া ব্যক্তিদের দলে নাকি অসফলতা বা ব্যর্থতার জালে আটকে পড়া ব্যক্তিদের দলে? সফলদের পথে নাকি অসফলদের পথে? আমাদের পথনির্দেশের জন্য আসুন, তিনটি হাদিসের দিকে দৃষ্টি ফেরাই—
প্রথম হাদিস:- “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর পুরস্কারের আশায় রামাদানে সিয়াম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” [সহিহ বুখারী, ৩৮]
কথাগুলো একটু ভিন্নভাবে দেখি— “যে ব্যক্তি রামাদান মাসে ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার প্রাপ্তির আশা নিয়ে সিয়াম (রোজা) পালন করে, তার পূর্বে সংঘটিত সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” [অর্থাৎ, সে যেন এক নতুন পাপমুক্ত জীবন লাভ করে। আর এই ক্ষমা লাভের পথে রয়েছে আল্লাহর অসীম রহমত, যা কেবল রমজানেই উপলব্ধি করা সম্ভব। এটি একটি অপূর্ব সুযোগ, যেখানে একজন মুমিন তাঁর সকল গুনাহ মুছে ফেলতে পারে, এবং নতুন করে আল্লাহর পথে চলতে শুরু করতে পারে।]
দ্বিতীয় হাদিস:- “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর পুরস্কারের আশায় কিয়াম (রাত জেগে ইবাদত, রাতে নফল ইবাদত) করে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” [সহিহ বুখারী, ৩৭]
কথাগুলো একটু ভিন্নভাবে দেখি— “যে ব্যক্তি রামাদান মাসে ঈমানের সঙ্গে এবং আল্লাহর পুরস্কারের প্রত্যাশায় রাতে কিয়াম (নফল ইবাদত, রাত জেগে নামাজ) পালন করে, তার পূর্বে সংঘটিত সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” [রামাদান মাসে রাতের ইবাদত এমন এক অমূল্য রত্ন, যা জান্নাতের দিকে আমাদের এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। এই হাদিসে] রাতের ইবাদতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মুমিনের অন্তরের শুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অপার সুযোগ বা ফুরসত।)
তৃতীয় হাদিস:- “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কারের আশায় রামাদানে সিয়াম পালন করে, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কারের আশায় লাইলাতুল কদরে (রাত জেগে) সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” [সহিহ বুখারী, ২০১৪]
কথাগুলো একটু ভিন্নভাবে দেখি— “যে ব্যক্তি রামাদান মাসে ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর পুরস্কারের প্রত্যাশায় সিয়াম পালন করে, তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। একইভাবে, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর পুরস্কারের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে সালাত (বিভিন্ন ধরনের নফল নামাজ) আদায় করে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তার পূর্বে সংঘটিত সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।” [লাইলাতুল কদর হলো একটি বিশেষ রাত, যার সম্মানিত মর্যাদার কারণে এই রাতে দোয়া ও ইবাদতের পুরস্কার অন্য যে কোনো রাতের তুলনায় অনেক বেশি। একে হারিয়ে ফেললে প্রকৃত দুঃখজনক বিষয় কিছু হতে পারে না।]
হাদিসগুলো কি খেয়াল করেছেন? হাদিসগুলো কী গভীরভাবে লক্ষ্য করেছেন? সেখানে ক্ষমার প্রতিশ্রুতি বারবার উচ্চারিত হয়েছে। সিয়াম, কিয়াম, লাইলাতুল কদর—এই তিনটি বিষয় আমাদের জন্য ক্ষমা পাওয়ার অপার সুযোগ এনে দেয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে জান্নাতের দরজা খুলে দেয়। অথচ যারা এই মাসের মর্যাদা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়, তাদের জন্য কী রয়েছে? কিছুই কী অবশিষ্ট আছে?
একটি ভয়াবহ হাদিস আছে, যেখানে নবী (ﷺ) এমন কিছু মানুষের জন্য বদ-দোয়া করেছেন, যারা রামাদানের সুযোগ পেয়েও ক্ষমা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে—
হযরত আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত: “রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একদিন মিম্বারে আরোহণের সময় প্রতিটি ধাপে আমীন বললেন। সাহাবীগণ (رضي الله عنهم) জানতে চাইলেন—‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি কেন (এভাবে প্রতিটি ধাপে) আমীন বললেন?’ নবী (ﷺ) উত্তরে (জানাতে চাওয়ার তৃষ্ণা মেটাতে) বললেন, ‘জিবরাঈল (عليه السلام) এসে দোয়া করলেন—আল্লাহ তাআলা সেই ব্যক্তির নাক ধুলোয় ধূসরিত করুন, যে রামাদান পাওয়ার পরও ক্ষমা অর্জন করতে পারল না। তাই আমি বললাম—আমীন।’” [মুসনাদে আহমাদ, ৭৪৫১]
এই হাদিস কি আমাদের জন্য যথেষ্ট ভয়াবহ নয়? যেখানে নবীজী (ﷺ) নিজেই এমন ব্যক্তির জন্য বদ-দোয়া করেছেন, সেখানে সে ব্যক্তি কীভাবে আল্লাহর ভালোবাসার আশা করতে পারে? আচ্ছা! স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কি আমাদের এই গাফিলতি দেখে চুপ থাকবেন? যদি রামাদান শেষ হয়ে যায়, আর আমরা তখনো অপরাধের সাগরে নিমজ্জিত থাকি, নিজেদের পাপ ক্ষমা করানো থেকে বিরত থাকি, তবে হয়তো আমাদের রব বলবেন—
“আমার বান্দা আমাকে ভুলে বসেছিল। আমি তাকে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছিলাম। প্রত্যাবর্তনের ফুরসত দিয়েছিলাম। খুব ধীরে হলেও সে এসেছিল, কিন্তু আমার ভালোবাসাকে প্রাধান্য না দিয়ে সে আবার পাপে ফিরে গেল। পাপের কাজে নিমজ্জিত হয়ে গেল। আমার দেয়া অপার সুযোগের কদর (সম্মান) করল না, আমার দয়ার আহ্বানকে উপেক্ষা করল। তাহলে কেন আমি তাকে ক্ষমা করব?”
তখন আমাদের অবস্থাটা কেমন হবে? এই কথাটি হয়তো কবিতাতে এভাবেই হবে—
সে আসে ধীরে;
তবে শুধু তীরে,
আসেনি তার ছায়া।
এসে যায় ফিরে,
আবারো তার নীড়ে,
লাগেনি তার মায়া।
রামাদান আমাদের জন্য একটি নতুন শুরু, একটি নতুন সুযোগ। এটি যেন সেই দরজা, যা একবার খোলে, কিন্তু কেউ যদি ঢুকতে দেরি করে, তবে সেটি বন্ধ হয়ে যায় চিরতরে। এবার আমরা কি সেই সুযোগ কাজে লাগাব? নাকি আবারো হাতছাড়া করব?
রামাদান যেন এক প্রদীপ, যার শিখায় জ্বলতে থাকে ক্ষমা, দয়া ও রহমতের আলোকবিন্দু। কিন্তু বাতাসে দুলতে থাকা সেই শিখা টিকে থাকবে কি? যদি আমরা অবহেলায় পাশ কাটিয়ে যাই, যদি সেই আলোকে আত্মস্থ না করি, তবে একদিন নিভে যাবে সে প্রদীপ, আর আমাদের চারপাশ ছেয়ে যাবে গহীন আঁধারে। এই মাস আসলে একটি সুবর্ণ সুযোগ—নিজেকে নতুন করে গড়ার, কলুষতা মুছে ফেলার, আলোর পথে ফিরে আসার। কিন্তু যদি আমরা দেরি করি, যদি দ্বিধায় পিছিয়ে থাকি, তবে সেই দরজাও হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে চিরতরে। তখন শুধুই থেকে যাবে না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস, নিভু নিভু প্রদীপের নির্বাপিত স্মৃতি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন